শুক্রবার ২৭ এপ্রিল ২০১৮


যানজট আর জনজটে বিপর্যস্ত আমার প্রিয় ঢাকা


আমাদের অর্থনীতি :
08.04.2017

 

ফাহমিদা হক

লেখক: পরিচালক, সিসিএন

কোলেস্টেরল না থাকলে আমরা যেমন বাঁচতে পারি না আবার খারাপ কোলেস্টেরলও আমাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। যেকোনো দেশের যানজট যেমন কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক নির্ধারণ করে, আবার তার উল্টো ঘটনা ঘটে আমাদের মতো জনবহুল অপরিকল্পিত শহরের বেলায় যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তাঘাট কম কিন্তু জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বেশি। আর এই ভারসাম্যহীনতা আমাদের খারাপ কোলেস্টেরলের মতো দিনে দিনে অকেজো করে দিচ্ছে, যার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

কোনো পরীক্ষার্থী যখন সকালবেলায় নির্ধারিত সময়ের তিন ঘণ্টা আগে বাসা থেকে বের হয়েও পনের মিনিটের রাস্তা শেষ করে যথাসময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না, সেই শহরে যানজটকে আর যাই হোক উন্নয়নের অগ্রগতিতে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। কোনো রোগীকে যখন চট্টগ্রাম থেকে ছয় সাত ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে ঢাকার যানজটে পড়ে কয়েক মিনিটের পথ অতিক্রম করতে না পেরে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রাস্তায় মৃত্যু পথের যাত্রী হতে হয় তখন সেই নগরীকে আমরা কোন উন্নয়নের খাতায় নাম লেখাব, কর্ম দিবসের শুরুর দিন থেকে সপ্তাহের প্রতিটি দিনই যদি এই যানজটে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেয়ে ফেলতে হয়, কর্ম দিবসের শেষে তার থেকে আমরা কি আশা করতে পারি। দুর্বিষহ এই যানজট এখনি নিয়ন্ত্রনেণ আনতে না পারলে এই শহর স্থবির হয়ে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। তাই যেকোনো উপায়ে এই অবস্থা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

রাজধানী ঢাকার যানজট অনেক আগেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ঢাকায় বসবাসরত বা ঢাকার বাইরে থেকে কাজের উদ্দেশ্যে আসা কোনো মানুষের পক্ষেই এই মুহূর্তে দিনে একটি প্রোগ্রামের বেশি কাজ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যানজটের এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে শহরবাসীরা হয়তো নিজেদের কর্ম প্রণয়ন করে কোনোভাবে চালিয়ে নিতে পারে কিন্তু মফস্বল থেকে আসা কোনো মানুষের পক্ষে সেক্ষেত্রে একদিনের কাজ বিভিন্ন বিড়ম্বনায় তিনদিনেও শেষ করতে কষ্ট হয়। ঢাকার যানজট প্রচলিত অর্থে কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়। রাজধানী বলে প্রতিদিন নানা কাজে বহু মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসে। কারণ এখানে সচিবালয়, রাষ্ট্রপ্রতি, প্রধানমন্ত্রীর অফিস, অন্যান্য মন্ত্রীদের অফিস, বিভিন্ন সরকারি দফতরের হেড অফিস, দূতাবাস, বিদেশি সংস্থার অফিস, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রধান কার্যালয়সহ আরও কত কি। এককথায় সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই ঢাকা। যেহেতু  এই শহরকে কেন্দ্র করেই সবকিছু তাই এর মতো অসহনীয় সমস্যাকে সমাধানের জন্য সমাজের বিভিন্ন দিককে দেখতে হবে ৩৬০ ডিগ্রিতে। এক পাক্ষিকভাবে গবেষণা ছাড়াই শুধুমাত্র ফ্লাইওভার নিয়ে চিন্তা করা অথবা তথাকথিত ‘মাস্টারপ্লান’ কেন্দ্রিক পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকা, নগর সমস্যার ব্যাপ্তি না বোঝার ফসলই হলো যানজটের স্থানান্তরের খেলা। অপরিকল্পিত আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অভাবে প্রতিবছর একই কাজ নতুন করে খরচ বাড়িয়ে টাকার অপচয় ছাড়া যানজট বা রাস্তার কোনো উন্নয়ন বলতে কিছুই হয় না। যা হয় তা জনমানুষের দুর্ভোগ। ২০১৫ সালে ঢাকা শহরের যানজটের কারণ ও প্রতিকারের উপায় বের করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে একটি তিন সদস্যবিশিষ্ট সাব কমিটি গঠন করা হয়। প্রায় দুই বছর অনুসন্ধান করে এই যানজটের বিভিন্ন কারণ ও প্রতিকারে রাজধানীর যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে রাস্তার ক্রসিং বা মোড় আর ইউটার্নগুলোকে। এছাড়া বিশৃঙ্খল গাড়ি পার্কিং যানজটের আরও একটি অন্যতম কারণ। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশও যানযটের জন্য দায়ী। তাদের কারণেই মূলত ডিজিটাল সিগন্যালগুলোর যথাযথ ব্যবহার হয় না। সড়ক বন্ধ করে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের নানা কর্মসূচিও কম দায়ী নয়। এছাড়াও আছে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা আর তাদের পুরো বছর জুড়েই নগরীর বিভিন্ন সড়কের অপরিকল্পিত খোড়াখুড়ি। ঢাকার রাস্তায় এখন আর কোনো জেব্রা ক্রসিং চোখে পড়ে না। নানা গতির এত বিচিত্র যানবাহন পৃথিবীর আর কোনো সড়কে একই সঙ্গে চলাচল করে এমনটা আমি দেখিনি।ঢাকা শহরের আয়তন ও যানবাহনের বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে প্রয়োজনীয় রাস্তা সম্প্রসারণ করা হয়নি। এছাড়া বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে যে সমস্যাটি দেখা দিয়েছে তা হচ্ছেÑ ভিআইপি ও উনাদের ফ্ল্যাগ স্টেন্ডের নামে দুইয়ের অধিক গাড়ির ব্যবহার এবং ব্যবহারকারীদের গাড়ি উল্টো পথে চলা। তাছাড়াও রয়েছে ধানমন্ডি, বনানী, গুলশান, লালমাটিয়া, উত্তরার মতো জায়গায় একাধিক স্কুল ইউনিভার্সিটি যাতে পড়ালেখা করা ছাত্রদের প্রায় সবার রয়েছে আলাদা আলাদা বাহন এতে করে এই সব এলাকায় সপ্তাহে পাঁচদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে আছে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক ভবন, ফুটপাত দখল, ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা।

গত ১৬ বছরে ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি নিয়ে দফায় দফায় প্রকল্প হাতে নিয়েও এর কোনো সুফলই পায়নি নগরবাসী। বাতিগুলো যথা নিয়মে জ্বলে-নিভে ঠিকই কিন্তু যান চলে সেই ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। আর ব্যয়বহুল প্রত্যেকটি কার্যক্রম হয় সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। মানসম্পন্ন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ফুটপাত যেখানে একটি চলমান নগরীর পরিচিতি বহন করে সেখানে আমাদের ঢাকা শহরের ফুটপাত পরিণত হয় যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তাদের নাম ভাঙানো মাফিয়াদের কিংবা স্থানীয় মাস্তানদের নোংরা বাণিজ্যের দোকানপাটে। বিশাল জনগোষ্ঠীর শহর ঢাকায় যানজটের জন্যে যে শুধু সময়ই নষ্ট হয় তা নয়। ক্ষতি হয় বিপুল পরিমাণ জ্বালানির। আর দূষিত নগর হিসেবে আমরা সেই কবেই বিখ্যাত হয়ে আছি।

শিল্পোন্নত বিশ্বে মেঘা সিটি যত বাড়ে তার সঙ্গে বদলায় তার অবকাঠামো কিন্তু আমাদের ঢাকা শহর সেই আদিতে যে ২০ লাখ লোকের পরিকল্পিত শহর ছিল আজ সেখানে প্রায় ২ কোটি লোক বাস করছে; তাতেও শহরের অবকাঠামোর তেমন কিছুই রূপান্তর, পরিবর্ধন বা পরিমার্জন আসেনি। যেখানে ঢাকা শহরের রাস্তা থাকা দরকার পঁচিশ ভাগ সেখানে আছে আট ভাগ। এই শহরের সড়ক যেখানে ৩ লাখ লোক চলাচলের উপযোগী সেখানে ১১ লাখ লোক চলাচল করে। ঢাকা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণে আনতে হলেÑ

এক. ক্রসিংগুলো বন্ধ করে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ডিএমপি ও অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক ভূমিতে এবং ভূমির উপরে ইউলুপ নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। দুই. পরিবেশের ক্ষতি না করে বহুতল ভবন পার্কিং তৈরি করতে হবে। তিন. ঢাকা শহরের আয়তন ও যানবাহনের বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে প্রয়োজনীয় রাস্তা নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। ভিআইপিদের নামে বরাদ্দকৃত গাড়ি ঠিক নিয়মে চলতে হবে। প্রাইভেটকারের সংখ্যা কমিয়ে স্কুল-কলেজ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্যে বাসের ব্যবস্থা করতে হবে। চার. ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী করতে হবে। যাতে স্বল্প দূরত্বে মানুষ হাঁটার পরিবেশ পেয়ে হাঁটতে পারে।

মোটকথা যানজট নিরসনে ডিজিটাল, এনালগ, রশি, ফিতা, সিগন্যাল, ট্রাফিক, জল্পনা-কল্পনা কোনোকিছুই আমাদের এই শহরকে যানজট নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের রাজনৈতিক সরকার, পরিকল্পনাবিধ, সড়কপ্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। উপরে উল্লেখিত সবার কাজের প্রকৃতি ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্য হতে হবে অভিন্ন। ঢাকার যানজট নিরসনে নগর প্রশাসনের বা সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। নগরবাসীকেও তাদের নাগরিক দায়িত্ব পালনে সচেতন এবং রাস্তার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। অন্যথায় পুরো সভ্য শিক্ষিত নগরবাসীকে একত্রে হাহাকার করেই মরতে হবে।

সম্পাদনা: আশিক রহমান