শুক্রবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭


৯/১১ বিশ্ব কাঁপানো সন্ত্রাসী হামলার ষোড়শ বার্ষিকী


আমাদের অর্থনীতি :
11.09.2017

জ্বলে ওঠা বিশ্ব কাঁপানো সন্ত্রাসী হামলার ১৬টি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল। সারাবিশ্ব অবাক বিস্ময়ে সেদিন দেখেছিল টুইন টাওয়ারের ধসে পড়া, দেখেছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে। তারপর দীর্ঘদিন সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাও মানুষের আছে। ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বর সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত দিন। এদিন নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসিতে হাইজ্যাক করা বিমান দিয়ে চালানো হয়েছিল সন্ত্রাসী হামলা। হাজার হাজার মানুষ সে হামলায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। অসহায় মানুষদের আর্তনাদে সেদিন ভারি হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর বাতাস। চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই-এর মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছিল সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। নিউইয়র্কে ম্যানহাটানের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, ওয়াশিংটনের পেন্টাগন সদর দফতরে মোট তিনটি বিমান বিধ্বস্ত করে তারা ভবনগুলো ধ্বংস করে। হাইজ্যাক করা চারটি বিমানের দুটি আঘাত হানে টুইন টাওয়ারে, একটি পেন্টাগনে এবং চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম শোকাবহ দিবসে আমরা তীব্র ঘৃণা উচ্চারণ করছি সন্ত্রাসী কর্মকা-ের। সে সময়ের পলাতক ওসামা বিন লাদেন এ হামলায় সমর্থন ও অর্থায়ন করেছিল। ইসরাইলের প্রতি আমেরিকার ক্রমাগত সমর্থন, পারস্য উপসাগরে দেশটির ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অব্যাহত সামরিক উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা চালানো হয় বলে ধারণা করা হয়।

আসলে বেদনাবিধুর নাইন-ইলেভেনের ষোড়শ বার্ষিকীতে আমরা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রত্যয় খুঁজে পাই। সেদিন ধূলিস্যাৎ হওয়া নিউইয়র্কের ১১০ তলার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে নিহত হয়েছিল প্রায় তিন হাজার মানুষ। যাদের মধ্যে ছিলেন এক দম্পতিসহ ছয়জন বাংলাদেশি।

দুই. ইতোমধ্যে ৯/১১ এর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৮০০ ব্যক্তি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করেছেন। কারণ ওই ঘটনায় জড়িত ১৯ বিমান ছিনতাইকারীর মধ্যে ১৫ জনই ছিল সৌদি এবং দুজন আমিরাতের নাগরিক বলে দাবি করা হচ্ছে। অবশ্য, এ ধরনের মামলা করার সময়সীমা ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যেই শেষ হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ কেউ বলেছেন, ৯/১১ ঘটনায় ছিনতাইকারীদের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের যোগসাজশের বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ ৯/১১ কমিশনের প্রতিবেদনে ইউএইর নাম ৭০ বারের বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের অর্থ যোগানো সংক্রান্ত বিষয়েও একবার দেশটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯/১১ হামলায় জড়িত বেশিরভাগ সন্ত্রাসী দুবাই হয়ে আমেরিকায় গেছে। সন্ত্রাসী হামলায় যে অর্থ ব্যয় করেছে তা ইউএই থেকে গেছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। আজকে যে কাতারকে সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসকে অর্থায়নের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে তার পেছনে অতীতে সৌদি এবং আমিরাতের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সম্পর্কের উৎসও খুঁজে বের করা দরকার। আল-কায়েদার মতো জঙ্গি সংগঠনকে এ হামলার জন্য প্রধান দোষী করা হয়। আফগানিস্তান থেকে পরিচালিত এ হামলার পাল্টা জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। আফগানিস্তান থেকে তালেবান সরকারকে উৎখাত করা হয়। ইরাক-আফগানিস্তানের সরকার উৎখাত করার পর দেশ দুটির কর্তৃত্ব পরোক্ষভাবে আমেরিকার কাছেই চলে যায়। পর্যায়ক্রমে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন, আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেন, লিবিয়ার নেতা মোয়াম্মার গাদ্দাফিসহ আরও কয়েকজন নেতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়- ৯/১১ এর জেরে শুরু হওয়া মার্কিন প্রতিশোধে।

তবে ৯/১১ এর হামলা ছিল জঙ্গিবাদীদের সন্ত্রাসী হামলা। এদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘যুদ্ধকেই’ তারা একটি আদর্শ বলে গ্রহণ করে। সহিংসতা তাদের মোক্ষম হাতিয়ার। জঙ্গিবাদীরা আক্রমণাত্মক আদর্শের অনুসারী এবং নিজেদের মতাদর্শকে তারা সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে। এদেশের জঙ্গিবাদীরা তাদের মতাদর্শের ধর্মীয়করণ ঘটিয়েছে। যেমন ইসলামি জঙ্গিবাদ। আর সেই বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় চেতনা ও মতাদর্শের আধিপত্য কায়েমের জন্য সেই মতাদর্শের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র নিষ্ঠুর ক্ষমাহীন সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে উদার মানবতাবাদ ও গণতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফ্যাসিবাদী হিটলারের মতোই সব জঙ্গিবাদীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আক্রমণ, বলপ্রয়োগ এবং যুদ্ধ করে নিজের মতবাদ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। মূলত ধর্মীয় জঙ্গিবাদীরা নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। যেমন তালেবানদের মতোই আইএস বা ইসলামি জঙ্গিরা সব বিধর্মীর বিরুদ্ধে জিহাদ, ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের আহ্বান জানায়। কেবল ব্যক্তি নয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মুসলমান শাসক তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে থাকলে সহিংস কর্মকা- ও অপপ্রচারের মাধ্যমে সেই ক্ষমতাবানদেরও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় জঙ্গিরা। বিশ্ব সেদিন দেখেছিল নানা দেশে তারা ছড়িয়ে গেছে। আর তারপরই বাংলাদেশেও একাধিক জঙ্গিবাদী সংগঠনের অপতৎপরতা বেড়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা কিংবা ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলা সেই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

তিন. ৯/১১ এর পর গ্রাউন্ড জিরোতে এখন গড়ে উঠেছে ফ্রিডম টাওয়ার। দালানের উচ্চতার দিক থেকে টুইন টাওয়ারকে ছাড়িয়ে যাওয়া ফ্রিডম টাওয়ারেই নির্মিত হয়েছে সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল স্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা স্থাপনা পেন্টাগনকেও ঢেলে সাজানো হয়েছে। সেদিন হোয়াইট হাউসের দিকে উড়ে যাওয়া আরেকটি বিমান মাঝ আকাশে ভূপাতিত হয়েছিল যাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশ্ব ইতিহাসে সেদিনের মতো সমন্বিত আর ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা পরবর্তীতে আর দেখা যায়নি। কারণ ওই ঘটনার মূল হোতাদের নির্মূল করা হয়েছে ২০০১ সালের পরপরই। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর বদলে যায় আমেরিকা। এর জের ধরে বদলে গেছে বিশ্ব আর বৈশ্বিক রাজনীতি। বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিভাজন শুরু হয়ে ৯/১১’র মাধ্যমে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বলেছিলেন, ‘হয় তুমি আমার সঙ্গে, নয় তুমি আমার বিপক্ষে। মাঝামাঝি কিছু হতে পারে না।’ বর্তমান শতাব্দীতে এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সন্ত্রাসীরা একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। যারা তাদের গোপনে সহায়তা করত তারাও এখন বর্জিত হচ্ছে। কারণ ৯/১১-এর পরও বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলা থেমে থেমে হুঙ্কার দিয়ে উঠেছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসীদের দমন করার জন্য বিশ্ব এখন একত্রিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও এখন সন্ত্রাসীদের বিষয়ে ‘জিরো’ টলারেন্স দেখাচ্ছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে  ৯/১১ এর মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা আর দেখা যাবে না।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ  এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদনা: আশিক রহমান