রবিবার ২৪ জুন ২০১৮


সংযমের মাসে অসংযমীদের দৌরাত্ব্যের অবসান প্রত্যাশিত


আমাদের অর্থনীতি :
23.05.2018

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

 

সাধারণভাবে রমজান মাসকে সংযম-সাধনার মাস বলে সবাই জানে। পবিত্র ধর্মের শিক্ষিাও তাই। দীর্ঘ এক মাস মানুষ দিনের বেলায় শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকবে না, সব ধরণের লোভ, হিংসা-বিদ্বেষে, অকল্যাণকর অপকর্ম থেকে বিরত থাকবেÑ এটাই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে তা ধারণ করার চেষ্টা হয়তো করছে, কিন্তু আমাদের সমাজের দিকে তাকালে আমরা এই সময় দুটো চ্ত্রি একসঙ্গে চলতে দেখে আসছি। এক. রোজা রাখা, ধম-কর্ম করা, গরিবদের মধ্যে সাধ্যমতো কাপড় ও অর্র্থকড়ি বিতরণ করা। দুই. পাল্লা দিয়ে টাকা পকেট ভরা। আমাদের উদ্বেগের জায়গাটি হচ্ছে, দ্বিতীয় চিত্রটির বিস্তার দেখে রমজান আসছে এমন সময় যত ঘনিয়ে আসে তত বাজারে সব ধরনের কাঁচা বাজার বল্গাহীনভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হাজারটি খোঁড়াযুক্তি দাঁড় করানো হয় বিক্রতা, পণ্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে। দেশে লাখ লাখ মানুষ এর সাথে জড়িত। তবে এদের উৎপাদক এবং ভোক্তা উভয়ই সবচাইতে অসহায় অবস্থায় পড়েন, পরিস্থিতির শিকার হন। উৎপাদনকারীরা প্রায়শ্চই এমন চাহিদা বাড়ন্ত সময়েও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, তাদের ঠকাচ্ছে ফড়িয়ারা,মধ্যস্বত্বভোগীরা। এক হাত দুহাত করে কয়েক হাত বদলিয়ে দোকানে যখন ক্রেতা কিনতে যান তখন তারা পকেটেই সঞ্চয় ধরে যেন টান দেয় প্রতিটি দোকানি। অথচ হঠাৎ পণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্ন তোলা হলে আঙ্গুল তোলা হয় অন্যের দিকে। সেটি একধরনের প্রবণতা। সব ব্যবসায়ী তা করেন কিন্তু বলা হচ্ছে না। কিন্তু কত শতাংশ মানুষ যুক্তিসঙ্গত লাভ করে ছোট, মাঝারি বা বড় ব্যবসা করেনÑ সেটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। অন্য দিকে রমজান উপলক্ষে ভেজাল খাদ্য, পণ্য সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছে অসংখ্য মানুষ। দেশে এখন কোনো ফলই নির্ভয়ে খাওয়া যাচ্ছে না। অতি লাভের লোভে কাঁচা ফল বাজারে আনা হচ্ছে নানা ধরনের রাসায়নিক জীবননাশী ঔষধ দিয়ে। রোজার আগেই হলুদ পাকা আমের আড়ৎ সাজিয়ে এক শ্রেণির অর্থলিপসু ব্যবসায়ী মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিষয়টি তাদের মোটেও অজানা নয়। তারপরও বাজারের কোনো ফলই নিরাপদ কিনা- তা কেউই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না।

বাজারে হরেক রকমের ইফতারি সাজিয়ে অনেকেই বসেছে তাদের মধ্যে ক’জন স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তা তৈরি ও সংরক্ষণ করেÑ তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। একইভাবে ঈদ উপলক্ষে পোশাক জুতা স্যান্ডেল থেকে  হরেক রকমের পণ্যের বিপুল চাহিদা থাকে এই রমজানে। কিন্তু মূল্য ছাড়ের চাইতে ক্রেতার পকেট কেটে বেশি অর্থ নেওয়ার প্রবণতা প্রায় সর্বত্রই। পরিবহন মালিক শ্রমিকরাও প্রস্তুতি নিচ্ছে কীভাবে সাধারণের কাছ থেকে অন্য  সময়ের চাইতে এই সময়ে অধিক মূল্য দেখিয়ে যাত্রী বহনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে। সরকারি অফিস-আদালতে বাড়তি অর্থ ছাড়া এ সময়ে ফাইল নড়ে না। ঈদ বোনাস শব্দটি সর্বত্র উচ্চারিত। যেখানে যাবেন, কেনাকাটা-করবেন ঈদ বোনাস বলে একটা কথা আছে না। আছে ঈদের বকশিস। শহরের বাসাবাড়ীতে ঈদ বকশিস চেয়ে কত ধরনের সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে। আসলে গোটা মাসটাতে সংযমের চাইতে অসংযমীদের দৌরাত্বই প্রতি বছর সর্বত্র বেড়েই চলছে। টাকা ধরার মহড়া দেখতে হচ্ছে, বাজারে সেই টাকা ছাড়ানোর প্রতিযোগীতা চলছে। যার আছে ভুরি ভুরি সে আকাশে যেন বেলুন ওড়াচ্ছেন, যার নেই তাকে নীরবে সব দেখতে হচ্ছে। প্রকৃত সংযমের শিক্ষাটি এভাবে কি ধারণ করা যায়? মনে হয় না ধারণ করা গেল বাড়তি অর্থের জন্য রমজান মাসের পবিত্রতা ক্ষুণœ হয় এমন অপকর্মে এত মানুষ অংশ নিত না, আইন ,নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করত না। এদশে নিয়মাবলী, সততা, আদর্শের চর্চা কত শতাংশ মানুষ করেন সেই প্রশ্নের আর কবে খুঁজতে চেষ্টা করব আমরা?

লেখক : অধ্যাপক,  ইতিহাস বিভাগ, বাউবি