বাগেরহাট প্রতিনিধি : বাগেরহাট সদর উপজেলার শেষপ্রান্তে পিরোজপুর-বাগেরহাট মহাসড়কের ফতেপুর বেইলি ব্রিজ। ব্রিজটি পার হয়ে বামে পিচ ঢালা আঁকাবাঁকা পথ। দু’পাশে বিস্তৃত মাঠ মাড়িয়ে সরু পথের সবুজ গ্রাম।
সবুজে ঘেরা সেই গ্রামের মধ্যে ছোট ছোট উঠোনে এক একটি বাড়ি। আর সে বাড়ির উঠোন কোনে বসতঘরের পাশেই ছোট আর একটি ঘর। রান্না ঘরের মতোই কিন্তু ঠিক রান্না ঘর নয়। বেড়া বিহীন ঘরগুলোতে চুলা আছে সারি সারি। সে চুলায় রান্না হয় ঠিকই, তবে তা ভাত, মাছ বা মাংস নয়, বালুর ভেতরে রান্না হয় চাল। আর তা থেকে তৈরি হয় মুড়ি।
হ্যাঁ এতোক্ষণ মুড়ির গ্রাম বারুইখালীর কথাই হচ্ছিলো। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার কচুয়া সদর ইউনিয়নের এ গ্রামটিতে প্রায় শতাধিক পরিবারের পেশা মুড়ি তৈরি। ঐতিহ্যগত ভাবেই এ গ্রামের বাসিন্দারা কয়েক পুরুষ ধরে দেশীয় পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ মুড়ি তৈরি করে আসছেন।
এক চুলায় মাটির হাড়িতে চলে শুকনো বালু গরম করা, অন্যপাশে অপর চুলায় চলে হালকা ভেজা চাল ভাজার কাজ। নারকেল পাতার শলা দিয়ে নাড়াচাড়ার পর ভাজা চাল হালকা হলদে-বাদামি বর্ণের হলে উত্তপ্ত বালুর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়। এবার মাটির হাড়ি নাড়াচাড়া দিতেই মট মট শব্দে ফুটে ওঠে ধোঁয়া ওড়া সাদা মুড়ি।
এসময়ও ঘর লাগোয়া উঠানে চলতে থাকে ধান শুকানো। পাশের তাফালের সামনে চলে ধান সেদ্ধ করা। সেদ্ধ সে ধান আবার মাটির চাড়িতে করে ভিজিয়ে রাখা হয় উঠোনের পাশেই।
মুড়ি তৈরির এ কৌশল গ্রামের প্রান্তিক মানুষের কাছে খুব সাধারণ হলেও শহরের মানুষের কাছে তা ঐতিহ্যের মিশেলে গ্রামীণ পরিবেশে শৈল্পিক এক পেশা।
স্থানীয় বারুইখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শেখ নিজাম উদ্দিন বলেন, বিস্তৃত ফসলের মাঠ, সবুজ গ্রাম, নদী-খাল সবই আছে এ গ্রামে।
শীতের মৌসুমে এখানকার মাঠ এবং জলাশয়গুলোতে বসে অতিথি পাখির আনাগোনা। দেশীয় ভাবে মুড়ি তৈরি, এখানকার জীবনযাত্রা এবং গ্রামীণ নান্দনিক পরিবেশ সঠিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হলে এ মুড়ি তৈরিকে কেন্দ্র করেই এখানে পর্যটনের বিকাশ হতে পারে। নান্দনিক এমন চিত্র ভিনদেশিদের পাশাপাশি আমাদের দেশের শহুরে মানুষকেও প্রশান্তি দেবে।
কচুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিকদার হাদিউজ্জামান বলেন, বংশানুক্রমে বারুইখালী গ্রামের মানুষ এ পেশার সঙ্গে জড়িত। কোন প্রকার রাসায়নিক বা ক্যামিকেল ছাড়াই দেশীয় পদ্ধতিতে তারা মুড়ি তৈরি করেন। স্থানীয় বাজার এমনকি জেলার বাইরে এ মুড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
কচুয়া উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানষ কুমার তালুকদার বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটকরা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, সিলেটের চা বাগান, পাড়াড়ি ঝর্ণা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘুরতে গিয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনযাত্রা, নিজস্ব তাতে তাদের পোশাক তৈরির কৌশল এবং তাদের তৈরি পোশাক কিনতে যান। জীবন জীবিকাকে কেন্দ্র করেই ওই সব এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।
একইভাবে স্ব স্ব এলাকার ঐতিহ্য, মানুষের জীবনযাত্রাকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে এ শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্য রক্ষা ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জেলা ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাটে ষাটগম্বুজ, মাজার, খানজাহানের প্রাচীন রাস্তাসহ বহু প্রাচীর নিদর্শন রয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম পছন্দ এখানে ভ্রমণ। পাশাপাশি এ ধরনের গ্রামীণ সৌন্দর্য তুলে ধরতে পারলে তা পর্যটকদের অনেক বেশি আকৃষ্ট করবে।
দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের শুরুর দিক থেকে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত রিয়াজুল হক মনে করেন, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজের পাশাপাশি এ অঞ্চলের ট্যুরিজম বিকাশে গ্রামীণ এ জীবনযাত্রা তুলে ধরতে পারলে তা গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হবে। এজন্য স্থানীয় অধিবাসী, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসতে হবে।
Amader Orthoneeti is a news portal. it's a voice of people.