উপকূলে অবাধে ভারতীয় চিংড়ি পোনা বিক্রিতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা

    মো. আব্দুল আজিজ, পাইকগাছা (খুলনা) : গত ২০ মে থেকে সরকার মা (বাগদা) চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ করেছে। যা আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
    সে অনুযায়ী বর্তমানে দেশের সকল হ্যাচারীতে পোনা উৎপাদন বন্ধ থাকার কথা এবং উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ বন্ধ থাকার কথা। সরকারের এ নির্দেশনা প্রায় ১ মাস হতে চলেছে। অথচ উপকূলীয় খুলনার পাইকগাছাসহ দক্ষিণাঞ্চলে অবাধে বিক্রি হচ্ছে চিংড়ির পোনা। অভিযোগ উঠেছে সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কিছু কিছু হ্যাচারী প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে নি¤œমানের পোনা আমদানী করে পোনা উৎপাদন করে বাজারে সরবরাহ করছে। এতে ঐসব হ্যাচারী মালিকরা অধিক মুনাফা অর্জন করলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চিংড়ি চাষিরা। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও গবেষকদের মতে ভারতীয় নি¤œমানের পোনা দেশের চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। চিংড়ির সমস্ত রোগ বালাই ও ভাইরাসের জন্য নি¤œমানের পোনাই প্রধান দায়ী।
    উল্লেখ্য, এক সময়ের কৃষি অধ্যূষিত উপকূলীয় এ অঞ্চলে ৮০র দশকে শুরু হয় লবণ পানির চিংড়ি চাষ। শুরুতেই অধিক লাভজনক হওয়ায় চিংড়ি চাষ ছড়িয়ে পড়ে গোটা উপজেলায়। ৯০ দশকের পর চিংড়িতে ভাইরাসসহ নানাবিধ রোগবালাই দেখা দেয়ার ফলে লোকসানের মুখে পরে সম্ভবনাময় এ শিল্প। মৎস্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে উপজেলায় ৪ হাজারেরও অধিক ছোট বড় চিংড়ি ঘের রয়েছে।
    এক সময় ঘেরে মজুদ করার শতভাগ পোনা প্রাকৃতিক উৎসের উপর নির্ভর করলেও বর্তমানে হ্যাচারীতে উৎপাদিত প্রায় শতভাগ পোনা ব্যবহার করা হয়।
    বর্তমানে উপজেলায় বছরে ৭৭ কোটি পোনার চাহিদা রয়েছে। যার আড়াই কোটির মতো স্থানীয় কয়েকটি হ্যাচারীতে উৎপাদিত পোনা সরবরাহ করা হয়। এছাড়া কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারীতে উৎপাদিত প্রায় ৩৫টির মতো ব্র্যান্ডের পোনা সরবরাহ করার মাধ্যমে অবশিষ্ঠ চাহিদা পুরণ করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল জানান, উপকূলীয় এ উপজেলায় বছরে পোনার চাহিদা রয়েছে ৭৭ কোটি। যার বেশির ভাগ পোনা কক্সবাজার থেকে সরবরাহ করা হয়। সরবরাহের ২০/৩০ ভাগ পোনা মাসম্মত হলেও বাকী ৭০/৮০ ভাগ পোনা নি¤œমানের। সাধারণত বাজারে গুণগত মানসম্মত পোনার দাম সাধারণ পোনার চেয়ে একটু বেশি থাকে। তাই মাঠ পর্যায়ে চাষিরা কমদামের নি¤œমানের পোনা বেশির ভাগ ব্যবহার করে থাকেন। আর এ নি¤œমানের পোনা ব্যবহার করার ফলে চিংড়ি আক্রান্ত হচ্ছে ভাইরাসসহ বিভিন্ন রোগবালায়ে। বিশিষ্ট চিংড়িচাষী ও পোনা ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া রিপন জানান, সরকার ২ মাস ব্যাপী মা চিংড়ি ধরা নিষিদ্ধ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত আরো বহু আগে নেয়া উচিত ছিল। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত শতভাগ বাস্তবায়ন হলে চিংড়ি শিল্পে হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। সরকারের এ নির্দেশনা উপেক্ষা করে কতিপয় হ্যাচারী মালিকরা ভারত থেকে নি¤œমানের নূক্লী আমদানী করে পোনা উৎপাদন করে তা বাজারে ছাড়ছে। আর উৎপাদিত এ নি¤œমানের চিংড়ি পোনা ঘেরে মজুদ করার ফলে ভাইরাসসহ দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন রোগবালাই। চাষী দাউদ শরীফ জানান, প্যাকেট জাত করা পোনার ব্যাগের গায়ে কোন নির্দেশনা থাকেনা, থাকে না উৎপাদন ও প্যাকেট জাত করার তারিখ। এমনকি পোনার সংখ্যা ও ওজনও থাকেনা। বাধ্য হয়ে আমরা সাধারণ চাষীরা শুধু মাত্র পোনার চেহারা দেখে ঘেরে মজুদ করতে হয়।
    বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট লোনা পানি কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলাম জানান, বাজারে সচারাচার মানসম্মত পোনার দাম একটু বেশি হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক ভাইরাসমুক্ত পোনা ঘেরে মজুদ করলে এবং ঘের ব্যবস্থাপনা সঠিক থাকলে ভাইরাস এবং রোগবালাইয়ের প্রকোপ অনেকাংশে কমে আসবে। এতে উৎপাদন বৃদ্ধিসহ চাষীরা অধিক লাভবান হবেন। ভারত থেকে আমদানী করা নি¤œমানের পোনা বন্ধ, মা চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ কার্যক্রম শতভাগ বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নে প্রচার প্রচারণাসহ জন সচেতনামূলক কর্মসূচী গ্রহণ ও উৎপাদন ও প্যাকেট জাতের তারিখ, পোনার সংখ্যা ও ওজন এবং ভাইরাস মুক্ত পোনা সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ চিংড়ি চাষীরা।

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *